কেজিডিসিএলে বাসা বেঁধেছে দুর্নীতি, প্রত্যাশায় গুড়েবালি

Print Friendly, PDF & Email

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম :

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) প্রতিষ্ঠার দশ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১০ সালের এ দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে এ কোম্পানির যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু দশ বছর পর এসে প্রশ্ন উঠছে- চট্টগ্রামের মানুষের চাহিদা কতুটুকু পূরণ করেছে? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধীরে ধীরে নানা অনিয়ম, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে এ প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি এখন ম্লান।

পরিচালনা বোর্ডে জনগণের প্রতিনিধি না থাকায় জনগণের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরার কেউ নেই। আবাসিক সংযোগের জন্য আবেদন জমা দিয়ে ২৫ হাজার গ্রাহক বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন। সর্বশেষ মধ্যরাতে বোর্ড বসিয়ে এমডিকে অন্ধকারে রেখে ৬০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার ঘটনায় বইছে সমালোচনার ঝড়। মন্ত্রণালয় থেকে ওই পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৭ কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করতে অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কেজিডিসিএল।

১৯৮০ সালে বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস নামে একটি কোম্পানি গঠিত হয়। কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ বৃহত্তর কুমিল্লা, বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রায় প্রতিটি উপজেলায় গ্যাস বিতরণ লাইন স্থাপন করে গৃহস্থালি গ্যাস সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে দেখা গেছে, বাখরাবাদ গ্যাসের রাজস্বের ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই আসে চট্টগ্রাম থেকে। কিন্তু কুমিল্লায় প্রধান কার্যালয় হওয়ার কারণে চট্টগ্রামের ছোট-বড় শিল্প গ্রাহকসহ সব গ্রাহককে কুমিল্লা ছুটতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো।

তাছাড়া বাখরাবাদ গ্যাসে নানা দুর্নীতি বাসা বাঁধে। চট্টগ্রামের গ্রাহকরা এই হয়রানি, দুর্নীতি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে চট্টগ্রামের জন্য পৃথক গ্যাস কোম্পানি গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই কেজিডিসিএল গঠন করা হয়। প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন চৌধুরীকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, অর্থ ও জনবল সংকটসহ নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও প্রতিষ্ঠাতা এমডি কোম্পানিকে এগিয়ে নেন। শিল্প-কারখানায় চুরি রোধ, বহু কোটি টাকা জরিমানা আদায়, গ্রাহক বৃদ্ধিসহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে কোম্পানিকে একটি ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। তবে বড় বড় শিল্প কারখানার চুরি ধরতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সানোয়ার হোসেন চৌধুরী টিকতে পারেননি। পরে কোম্পানিতে দুর্নীতি-অনিয়ম বাসা বাঁধতে থাকে। গ্রাহকদের মধ্যেও জমতে থাকে ক্ষোভ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে কোম্পানির শুরুর দিককার সাফল্য। নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য, শিল্প-কারখানায় মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে গ্যাস চুরি, মাঝপথে শিল্পে গ্যাস সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও সংযোগ না পেয়ে লোকসানে পড়া, কোম্পানির জন্য জায়গা-ক্রয়ে শত কোটি টাকার দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগের পাহাড় জমে। সর্বশেষ গত মাসে বোর্ড বসিয়ে এমডিকে অন্ধকারে রেখে ৬০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার ঘটনা ঘটে। সচিব (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ নুরুল আবচার সিকদারকে আহ্বায়ক করে ৮ সেপ্টেম্বর গঠন করা তদন্ত কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

কেজিডিসিএলে বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা ৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৯৮৫ আবাসিক গ্রাহক রয়েছে। শিল্প গ্রাহক রয়েছে ১ হাজার ১২৭। বাণিজ্যিক গ্রাহক ২ হাজার ৮৬২। ক্যাপটিভ পাওয়ার ১৯০, সার কারখানা ৪, সিএনজি স্টেশন গ্রাহক রয়েছে ৭০ জন। বর্তমানে ২৫ হাজারের বেশি আবাসিক গ্রাহকের আবেদন জমা রয়েছে।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাব সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, দশ বছর চলে গেলেও কেজিডিসিএল চট্টগ্রামের গ্রাহক তথা চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। নানা অনিয়ম, দুর্নীতি বাসা বেঁধেছে প্রতিষ্ঠানে। সিন্ডিকেট বাণিজ্য এখানে প্রকট। হাজার হাজার গ্রাহকের আবেদন বছরের পর বছর পড়ে আছে। তিনি বলেন, বোর্ডে মেম্বারদের সবাই সরকারি তথা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। জনগণের প্রত্যাশা, গ্রাহকের অভাব-অভিযোগের কথা বলার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। এই কোম্পানিকে গ্রাহকবান্ধব করতে হলে বোর্ডে জনগণের প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে হবে। যেমন- চট্টগ্রাম ওয়াসায় আছে।’

দশ বছরে কতটুকু এগুলো, গ্রাহকের অভাব-অভিযোগগুলোই বা কতটুকু সত্য- এ বিষয়ে জানার জন্য কেজিডিসিএলের এমডি খায়েজ আহম্মদ মজুমদারের মোবাইল ফোনে বুধবার কয়েকবার ফোন দেয়া হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *