চারপাশে সক্রিয় প্রতারকচক্র : সর্তক থাকুন

Print Friendly, PDF & Email

আইন সমাজ ডেস্ক:

সম্প্রতি রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদের প্রতারণার নানা ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁর মতোই ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা করা লোকজনকে নিয়ে আলোচনা চলছে। পুলিশ ও র‌্যাবের গোয়েন্দারা এরই মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি বাড়িয়ে বেশ কয়েকজন প্রতারককে ধরেছেন। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতারণা করে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে তিনটি পরিচয় বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতারকরা কখনো নিজেদের সরকারি দলের নেতা বলে পরিচয় দেয়। কখনো বনে যায় সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কখনো বা সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের মালিক সেজে প্রতারণা করে। এ জন্য তারা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে বা ফটোশপের মাধ্যমে ছবি বসিয়ে তা সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে প্রচার করে।

অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারের সুযোগ বেড়েছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রবণতা থেকে এ ধরনের অপরাধী বাড়ছে। এদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোরতার পাশাপাশি সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানান বিশ্লেষকরা।

রাজধানীর মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে নিয়মিত যান বগুড়ার শাহিনুল ইসলাম ওরফে শাহিন। সেখানকার কর্মকর্তারা তাঁকে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবেই চিনতেন। কখনো কোনো স্কুল বা শিক্ষকের ব্যাপারে তথ্য যাচাই, কখনো কারো ব্যাপারে সুপারিশ করা ছিল তাঁর কারবার। গত ১৬ জুন তিনি একজন যুগ্ম পরিচালকের কক্ষে গিয়ে নিজেকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সহকারী পরিচালক পরিচয় দিয়ে এক শিক্ষকের বদলির জন্য একটি চিরকুট দেন। গত ১১ আগস্ট তিনি ফের ওই যুগ্ম পরিচালকের কক্ষে যান। তখন যুগ্ম পরিচালক খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন যে ডিজিএফআইয়ের সহকারী পরিচালক পদে ওই নামে কেউ নেই। এরপর পুলিশে খবর দিলে মিরপুর থানা পুলিশ শাহিনকে গ্রেপ্তার করে।

এই প্রতিবেদকের মাধ্যমে ছবি ও পরিচয় নিশ্চিত হয়ে আরেকটি সূত্র জানায়, প্রতারক শাহিন মতিঝিলের বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনেও ভুয়া পরিচয় দিয়ে তদবির করতেন। স্বাস্থ্য বিভাগেও তাঁর ‘হাত’ আছে। মিরপুরে হাতেনাতে ধরা পড়লেও তাঁর যোগাযোগ এখনো চলছে!

জানতে চাইলে মিরপুর থানার ওসি মোস্তাজিজুর রহমান বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের করা মামলায় শাহিনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের নির্দেশে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। সেনা সার্জেন্ট থেকে অবসরে যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ভুয়া পরিচয়ে তদবির করতেন। এখন জামিনে ছাড়া পেয়ে সেই কাজ করছেন কি না জানা নেই।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. ফসিউল্লাহ বলেন, ‘দু-তিন বছর ধরে ওই লোক অধিদপ্তরে যাওয়া-আসা করছিল। সে আবার ছাড়া পেয়ে অপকর্ম শুরু করল কি না তা আমরা দেখব।’

বাবা-ছেলে মিলে প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে যাঁরা মন্ত্রী, উপদেষ্টা, পুলিশপ্রধানসহ বিশিষ্টজনের নাম ভাঙিয়ে অনেক মানুষকে বিপাকে ফেলছেন। দুটি ব্যাংকে থাকা গোলাম মোস্তফা আদর ও তাঁর বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুর হিসাবে প্রায় শতকোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ, যার কোনো বৈধ উ ৎস পাওয়া যায়নি। আদরের বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি ও পল্টনথানায় প্রতারণা, মতিঝিল থানায় অস্ত্র ও মাদক এবং উত্তরা থানায় অপহরণসহ হত্যা মামলা রয়েছে। এত অভিযোগের পরেও জামিনে মুক্ত থেকে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন আদর ও তাঁর বাবা। তাঁদের কবলে পড়ে রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন খুইয়েছেন পাঁচ লাখ টাকা। গত বছর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ঢাকার দুই ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক ও তারেকুজ্জামান রাজীবের পরিবারও তাঁদের খপ্পরে পড়ে। দুই কাউন্সিলরকে জামিনে মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে আদর তাঁদের পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন কয়েক লাখ টাকা।

পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, ‘এই প্রতারক বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা বিভিন্ন ভুয়া পরিচয়ে এসব অপকর্ম করেছে। তাদের ব্যাপারে আমরা তদন্ত শুরু করেছি।’

গত ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকা থেকে ফুল বিক্রেতা শিশু জিনিয়াকে (৯) ফুচকা খাইয়ে অপহরণ করা হয়। ওই ঘটনায় সোমবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে নূর নাজমা আক্তার লোপা তালুকদার (৪২) নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। পুলিশের গোয়েন্দারা লোপার সিনিয়র সাংবাদিক পরিচয়ে তদবির ও বহুরূপী প্রতারণার তথ্য পেয়েছেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ছবি রয়েছে তাঁর। তিনি নিজেকে পরিচয় দেন অগ্নি টিভির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, আওয়ামী পেশাজীবী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক, নবচেতনার সিনিয়র রিপোর্টার, মোহনা টিভির সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার, শীর্ষ টিভির পরিচালক, সাপ্তাহিক শীর্ষ সমাচারের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, বাংলাদেশ কবি পরিষদের সদস্য হিসেবে। অথচ পাচারের উদ্দেশ্যে শিশু জিনিয়াকে অপহরণ করেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর গলাচিপায় তিনটি হত্যা, অপহরণ, ও মানবপাচারের মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, পটুয়াখালীতে হত্যা মামলার রিপোর্ট করায় স্থানীয় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেন লোপা। রাজধানীর বাংলামোটরে তাঁর অবৈধ টিভি চ্যানেলের অফিস আছে। ব্যক্তিগত জীবনে অন্তত চারটি বিয়ে করা লোপার একমাত্র ছেলের আত্মহত্যা নিয়েও রহস্য রয়েছে। অনেকেই সাহেদের ‘লেডি ভার্সন’ বলছে লোপাকে।

গত ১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মগবাজারে নিউজ ২১ টিভি এবং পুরানা পল্টনে এবি চ্যানেলের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে মালিক শহিদুল ইসলাম ও সাপ্তাহিক সময়ের অপরাধ চক্রের মালিক আমেনা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। র?্যাব কর্মকর্তারা জানান, অনুমোদনহীন টিভি চ্যানেল ও পত্রিকার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ১০-১২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রলোভন দিয়ে প্রায় এক হাজার যুবকের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

গত ১২ আগস্ট শরীফ উদ্দিন নামের এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করেন কুমিল্লা পুলিশের গোয়েন্দারা। জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, শরীফ কখনো নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সচিব, কখনো উপসচিব, কখনো কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসম্পাদক, আবার বর্তমান আওয়ামী লীগ সদস্য বলে পরিচয় দেন। তদন্তে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আউটসোর্সিংয়ের কর্মী হিসেবে তিন মাস পিয়নের কাজ করেছিলেন এইচএসসি পাস করা শরীফ। চাকরি চলে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবির সঙ্গে নিজের ছবি বসিয়ে লোকজনকে দেখিয়ে প্রতারণা করে আসছিলেন তিনি।

গত ১৩ আগস্ট সিরাজগঞ্জের তাড়াশ থেকে রাব্বি শাকিল ওরফে ডিজে শাকিল নামে আরেক প্রতারককে গ্রেপ্তার করে বগুড়ার ডিবি। উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি (বহিষ্কৃত) ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ের আড়ালে তিনি কখনো প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কখনো সাংবাদিক-সম্পাদক। দেশি-বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেওয়া, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিসহ বিভিন্ন টোপ ফেলে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।

পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েছেন জেকেজি হেলথকেয়ারের আহ্বায়ক ডা. সাবরিনার মতো অনেক নারীও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করা রাহাত আরা খানম ওরফে ফারজানা মহিউদ্দিন ওরফে তূর্ণ আহসান ফেসবুকে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তূর্ণা আহসান নামে ফেসবুক আইডিতে তিনি ‘বিজয়লক্ষ্মী নারী’ গ্রুপ চালাতেন। টেলিভিশন টক শোতেও উপস্থিত হয়েছেন। গত ২১ জুলাই ১২ নাইজেরিয়ানের সঙ্গে গ্রেপ্তার হন এই তরুণী। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা বলছেন, ফেসবুকে বন্ধু হয়ে উপহার পাঠানোর নামে জালিয়াতচক্রের হয়ে কাস্টমস কমিশনার সেজে টাকা নিতেন রাহাত আরা।

২০ বছর ধরে পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে পাওনা টাকা আদায় করে কমিশন নেওয়া এবং সরকারের মন্ত্রী বা সচিব, উপসচিব পরিচয়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ অপকর্মে যুক্ত আকমল হোসেনকে গত ১০ আগস্ট গাজীপুর থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ আগস্ট মোশারফ হোসেন নামের অবসরপ্রাপ্ত এক হাবিলদার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বড় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফ্লাইট দেরি করিয়ে শেষে গ্রেপ্তার হন।

গত ২০ আগস্ট পল্টনে আবুল কালাম আজাদ নামের এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করে সিআইডি, যিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে ঝিলমিল প্রকল্পে প্লট দেওয়ায় কথা বলে এক ব্যক্তির প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। ১৯ আগস্ট সিআইডি তেজগাঁও থেকে সৈয়দ আরিফ হাসান রনিকে গ্রেপ্তার করে, যিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চাকরির কথা বলে প্রতারণা করেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা পরিচয় দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ৪ আগস্ট হবিগঞ্জে পুলিশ লাইনস থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শাহ আফজল হোসাইন নামের আরেক প্রতারককে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের মিয়া বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে টাউটদের ওপর নির্ভর করতে হয়। রাজনৈতিক দলের লোক পরিচয়ে অবৈধ প্রভাব খাটানোর ব্যাপারও আছে। আবার মিডিয়ার কিছু লোকের বিরুদ্ধে তদবির বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। এর ফলে যারা ভুয়া, ওরাও সুযোগটি নেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি আরো বলেন, এসব প্রতারণা ও জালিয়াতি যারা করে তাদের কঠোর কোনো শাস্তি হয় না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি নজরদারি চালানোর মাধ্যমে এমন অপরাধ দমন করা যেতে পারে। (কালের কন্ঠ)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *