‘প্রয়াত ড. আনিসুজ্জমানের রাজনৈতিক চিন্তা ও ধর্মবিশ্বাস’

Print Friendly, PDF & Email

অলিউল্লাহ নোমান : অতি সম্প্রতি প্রয়া ড. আনিসুজ্জামানকে নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত দৈনিক আমার দেশ বিশেষ প্রতিনিধি অলিউল্লাহ নোমান তার ফেইজবুকে বিশ্লেষনধর্মী স্টাটাস প্রদান করেছেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তা হুবহু তুলে ধরা হলো-

আওয়ামী ও ইন্ডিয়াপন্থি ড. আনিসুজ্জামান প্রয়াত হয়েছেন। ‘প্রয়াত’ শব্দটা অসাম্প্রদায়িক! তাই তাঁর ক্ষেত্রে ‘প্রয়াত’ শব্দটা মানানসই। ইন্তেকাল মানে হচ্ছে এক জগৎ থেকে অন্য জগতে পদার্পন করা। যারা ধর্ম বা পরকালে বিশ্বাসী তাদের ক্ষেত্রে ইন্তেকাল শব্দ ব্যবহার করা হয়। কেউ কেউ ‘ইন্তেকাল’ শব্দটাকে আবার সাম্প্রদায়িক হিসাবে মনে করেন। তাই অসাম্প্রদায়িক গোত্রের লোকরা মারা গেলে বলা হয়, প্রয়াত হয়েছেন। তবে এটা সত্য। তিনি যে বিশ্বাস নিয়েই প্রয়াত হউন না কেন, তাঁর শেষ কৃত্য হয়েছে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী। এটা তাঁর চিন্তার সাথে বেমানান কি না, এনিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে।
ড. আনিসুজ্জামানের পূর্ব পুরুষরা ১৯৪৭ সালে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছেড়ে এসেছেন। কোথয় এসেছেন? সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। মুসলমানরা নিজের ধমীয় পরিচয়ে বসবাসের জন্যই মূলত এ রাষ্ট্রটি তৈরি হয়েছিল। এ রাষ্ট্রটি তৈরির ভিত্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ। আনিসুজ্জামানের পূর্ব পুরুষদের কেউ দাওয়াত করে বা জোর করে পাকিস্তানে এনেছিলেন, এরকম ইতিহাস কোথায়ও খোজে পেলাম না। কেন তারা নিজ বসত ভিটা ছেড়ে এক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে এসেছিলেন তা মনে হয় খোজা দরকার রয়েছে। তবে আনিসুজ্জামান একজন জ্ঞান তাপস ছিলেন। তার জ্ঞান গরিমা নিয়ে আমার কোন প্রশ্ন নেই। তাঁর জ্ঞানের কোটি ভাগের একভাগের অনুপরিমানও আমার নেই। সুতরাং তাঁকে নিয়ে লেখার দৃষ্ঠতা দেখানোর সাহসও নেই আমার।
তিনি প্রয়াত হওয়ার পর তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানাভাবে লেখালেখি হচ্ছে। ইন্ডিয়াপন্থি দৈনিক প্রথম আলো তাঁর একটি পুরাতন সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। সেই সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের কথায় ধর্মীয় বিশ্বাসের বর্ণনা রয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তাঁর চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটেছে ওখানে। এরপর তিনি ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাওবা করে ইসলামে ফিরেছেন, এমন কোন তথ্য কোথায়ও পাইনি। সুতরাং ওই সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের মুখের কথাকেই আমি বিশ্বাস করি।
সুতরাং তাঁর সাক্ষাৎকারের চৌহদ্দিতেই আমার আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করব।
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। আনিসুজ্জামান জাতীয় অধ্যাপক ছিলেন। জাতির বড় বিবেক ছিলেন তিনি। আমাদের দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার প্রচারপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিষয়টি না বললেই নয়। ভিন্নমতের কোন বড় অধ্যাপক বা বড় চিকিৎসক, গবেষক ও প্রকৌশলীর নামের সাথে একটি বিশেষণ ব্যবহার করে থাকেন তারা। সেটা হচ্ছে, বিএনপি বা জামায়াত পন্থি অমুক। যেমন, শ্রদ্ধেয় এমাজউদ্দিনের কথাই যদি ধরি। তাঁর ক্ষেত্রে প্রায় সকল ইন্ডিয়াপন্থি পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া একটি বিশেষন দেয়। সেটা হচ্ছে, তাঁর নামের সাথে ‘বিএনপি পন্থি’ বুদ্ধিজীবী হিসাবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ড. আনিসুজ্জামান আগা-গোড়াই একজন আওয়ামী ও ইন্ডিয়াপন্থি জ্ঞনা তাপস ছিলেন। তাতে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। ওই ইন্টরভিউতে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কথাও বর্ণনা করেছেন। অথচ, কোন পত্রিকায় দেখলামনা তাঁকে এই বিশেষণটি ব্যবহার করতে। এমনকি তথাকথিত জাতীয়তাবাদীরাও দেখলাম, তাঁকে নিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন! যদিও তাঁর ইন্টারভিউতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সম্পর্কেও অনেক কটাক্ষ করা উক্তি রয়েছে!
আসুন আমরা ইন্টারভিউতে তাঁর নিজের মুখের উক্তি গুলো থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটা বিষয় দেখে নেই।
১/ ইন্টাভিউটির প্রথম প্রশ্নের উত্তরের শেষ দিকে তিনি বলেছেন-‘১৯৫২ সালের শেষ দিকে আমার ধর্ম বিশ্বাস চলে যায়। এর একটা কারন ছিল। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত আমি বেশ নাজাম পড়তাম। একদিন মসজিদে খুদবার সময়ে ইমাম সাহেব মুসলমানদের উন্নতি আর হিন্দু ও ইহুদিদের বিনাশ চাইলেন। এই শুনে মসজিদে যাওয়া বিনাশ করে দিলাম।’
পরিস্কার করেই তিনি বলেছেন, ১৯৫২ সালে তাঁর ধর্ম বিশ্বাস চলে গেছে। অতএব, এই বক্তব্যের পর ধর্ম বিশ্বাসে ফিরেছেন, এরকম কোন তথ্য আমার জানা নেই। কারো জানা থাকলে ইনবক্স বা কমেন্টস-এ দিতে পারে। এতে আমার ভুল দূর হবে।
তবে ইসলামের রীতি অনুযায়ী কেউ বিশ্বাস থেকে দূরে চলে যেতে বাধা নেই। তবে ফিরতে হলে তাওবা করে ফিরতে হয়। আর ইমাম সাহেবের কথা কিন্তু ইসলাম নয়। কোরআন, হাদীস, ইজমা এবং কিয়াস হচ্ছে ইসলাম শরীয়ার বিধান। তিনি এতবড় জ্ঞান তাপস ছিলেন। কিন্তু ইমাম সাহেবের এই বক্তব্যের পর কি একবারও ভেবেছিলেন, অন্য ধর্ম প্রসঙ্গে কোরআন এবং হাদীসে কি বলা হয়েছে!!! ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করার জন্য তিনি একটি অজুহাত দাড় করিয়েছেন ইমাম সাহেবকে!
২/ তাঁর ইন্টরভিউর এক জায়গায় বাংলাদেশে মুসলমানদের ধর্ম চর্চাকে আখ্যায়িত করেছেন, মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসাবে। তাঁর দৃষ্ঠিতে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারন হিসাবে উল্লেখ করেন-‘যে-পরাজিত শক্তি বলেছিল, বাংলাদেশ হলে ইসলাম থাকবে না: বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তারা কিন্তু নিষ্ক্রিয় থাকেনি। তারা বোঝাতে পেরেছে মুসলমান স্বতন্ত্র। মুসলমানদের পরিচয় আলাদ। এসব প্রচার অনেক কাজ দিয়েছে। আমাদের মায়েরা তো শাড়ি পরে নামাজ পড়ে মুসলমানের জীবন পার করে দিয়েছেন। তারা বোঝাতে পেরেছেন, শাড়ি মুসলমানের পোশাক নয়। এজন্য গ্রামের মা-বোনরা তাদের চিরন্তন পোশাক শাড়ি ছেড়ে স্যালোয়ার-কামিজ পরতে শুরু করেছে। মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে। গ্রামে অনেকেই মাদ্রাসায় ছেলে-মেয়েদের পাঠাতে আগ্রহবোধ করেন।’
তাঁর এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট মাদ্রাসা বেড়ে যাওয়া, মাদ্রাসায় ছেলে-মেয়ে পাঠানোকে তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। আসলেও কি গ্রামে মা-বোনেরা শাড়ি পড়েন না? আমি যে গ্রাম থেকে এসেছি, প্রাপ্ত বয়স্কা সব নারীকেই দেখেছি শাড়ি পড়তে! গত ৭ বছরে পরিস্থিতি কি দাড়িয়েছে জানি না।
৩/ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কটাক্ষ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রসঙ্গে। যেমন, এক জায়গায় মূলবোধের অবক্ষয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন-‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনলেন।’ অপর এক জায়গায় তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদের সময়ের সংবিধান সংশোধনী গুলো মেনে নেয়ার মত নয়। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তা অনুযায়ী রচিত চার মূলনীতিকেই সংবিধানের মূল ভিত্তি হিসাবে মনে করেন। এখন জিয়াউর রহমান ভক্তরা যদি আনিসুজ্জামানকে তাদের চিন্তাও আদর্শের জ্ঞান তাপস মনে করেন, তাইলে কারো কিছুই যায় আসে না। তবে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী। যার ফলে মানুষ তাঁকে আকুন্ঠ সমর্থন দিয়েছিল। পঞ্চম সংশোধনীর মূলনীতি গুলো জিয়াউর রহমান নিজে গড়া দলের গঠনতন্ত্রেও প্রতিস্থাপন করে গেছেন। এখন জিয়াউর রহমান ভক্তদের বিশ্বাস সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে, জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া গঠনতন্ত্রের মূলনীেিত নাকি আনিসুজ্জামানের বিশ্বাস অনুযায়ী রচিত চার মূলনীতিতে?? জিয়াউর রহমানের অনুসারী আনিসুজ্জামান ভক্তদের কাছে মনে হয় আমি এ প্রশ্ন রাখতেই পারি!
শুধু তাই নয়। বিসমিল্লাহিররামানির রাহিম বলে শুরুটাকেও তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
৪/ দীর্ঘ ইন্টারভিউর শেষ দিকে তিনি দেশের প্রগতির অন্তারায় হিসাবে একটা বিষয়কে চিহ্নিত করলেন। সেই বিষয়টা কি? আসুন তাঁর মুখ থেকেই জেনে নেই-
‘অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের ফলে আমাদের প্রগতির কিছু অন্তরায়ও দেখা দিয়েছে। যেমন মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের বড় সংখ্যক নাগরিক চাকরিবাকরি করছে। দেশে ফেরার সময় তারা ওই দেশের সংস্কৃতিটা সঙ্গে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশে যে এখন হিজাব ছড়িয়ে পড়েছে, সেটা হয়েছে এখন মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী বাঙ্গালীদের মাধ্যমে। সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে তারা ওখানকার সংস্কৃতিকে ইসলামী সংস্কৃতি মনে করছে। তারপর দেশে ফিরে এসে সে সংস্কৃতির চর্চা করছে।’
আচ্ছা আপনারাই বলুন তো দেখি, মধ্যপ্রাচ্যে কাজে যাওয়ার দুয়ার খুলেছে ১৯৭৯ সালের পর। এর আগে কি বাংলাদেশের নারীরা হিজাব বা বোরখা পরিধান করেনি! লন্ডন বা ইউরোপ তো খোলামেলা সংস্কৃতির দেশ। এখানে তো দেখি অধিকাংশ বাঙ্গালী নারী হিজাব পরেন। কোন দেশে গেলেই যদি সংস্কৃতির বিবর্তন হয়, তাইলে তো লন্ডনে আসা নারীদের খোলামেলা সংস্কৃতিতে রুপান্তরিত হওয়ার কথা! বাংলাদেশ থেকে নারীরা ইউরোপে এসে হিজাব পরেন কোন প্রভাবে! আনিসুজ্জামান হয়ত ভুলে গেছেন। তাঁর বাপ-অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ছেড়ে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে এসেছেন। মুসলাম সংস্কৃতিতে নারীরা পর্দা করেন। এই পর্দা ১৯৮০ সাল থেকে শুরু হয়নি। যেদিন থেকে এদেশের মানুষ মুসলামন হয়েছেন, ওইদিন থেকেই এ সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়েছিল।
এখানে প্রসঙ্গক্রমে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের একটি উক্তি উল্লেখ করতে চাই। আমাকে দেয়া এক ইন্টারভিউতে তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন। ইন্টারভিউটি ‘বিচার ও রাজনীতি’ নামে আমার একটি বইয়েও ছাপা হয়েছে। ওখানে তিনি ছোট বেলায় দেখা ঢাকা শহরের ষ্মৃতি বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, ঢাকা শহরে আগে নারীরা খোলামেলা বের হতেন না। কোথায়ও বের হতে হলে ঘোড়ার গাড়িতে বা রিক্সায় বড় কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে পর্দ তৈরি করা হত। সে পর্দার ভেতরে নারীরা বসতেন। আনিসুজ্জামানের বাপ-দাদারা এমন সংস্কৃতি জেনে বুঝেই তো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ত্যাগ করে এসেছিলেন সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে! তাই নয় কি! আর এখন তিনি দেখছেন নারীদের পর্দা বা হিজাব বেড়ে গেছে মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার কারনে! তাঁর এমন বক্তব্য সংস্কৃতি বিবর্তনের ইতিহাস বিকৃতি নয় কি?
পরিশেষে একটা বিষয় বলে শেষ করতে চাই। আনিসুজ্জামান জাতীয় অধ্যাপক হিসাবে জাতির বড় বিবেক ছিলেন। এতে কোন সন্দেহ নাই। দেশে গত ১৩ বছরে ভোটের সংস্কৃতিকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটা কি তিনি একাবরও কোথায়ও বলেছেন! গুম, খুন, ধর্ষনের খবর বের হচ্ছে প্রতিদিন খবরের কাগজে। মানুষের কথা বলার অধিকার নেই। আইন ও নীতিমালা তৈরি করে মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে ফ্যাসিবাদী সরকার। জাতির এতবড় বিবেককে কি এসব নাড়া দিয়েছে এই অত্যাচার নির্যাতন এবং নীপিড়নের বিষয় গুলো!! (কপি Oliullah Noman )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *