| ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী | সোমবার

কারো ধর্মে আঘাত দিয়ে কথা বলা যাবে না : প্রধানমন্ত্রী

Print Friendly, PDF & Email

আইন সমাজ ডেক্স, ১২ অক্টোবর ২০২০ বুধবার:

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশেষ করে মাদক ব্যবসা, পাচার, সেবন ও বিস্তারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ফলে মাদক অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মাদক প্রতিরোধের ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। তবে সেই সঙ্গে মাদকের কুফল বিষয়ে ছেলেমেয়েদেরও সচেতন করতে হবে। বাবা-মা, অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও নিজেদের ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তারা কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, ঠিকমতো ক্লাশে যাচ্ছে কী-না, মাদক ও জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে কী-না-এসব বিষয়েও নজর রাখতে হবে।

বুধবার একাদশ জাতীয় সংসদের ষষ্ঠ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে সরকারি ও বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাব দেন সংসদ নেতা।

এ সময় তরুণদের চাকরির পেছনে না ছুটে স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা হিসেবে অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন পর্যন্ত দেশের দুই কোটি মানুষের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কিন্তু দেশের অনেক শিক্ষার্থী ও ছেলেমেয়েদের মধ্যে এমন প্রবণতা রয়েছে, যেনতেনভাবে লেখাপড়া শেষ করেই চাকরির খোঁজে নেমে পড়ে। সবাই চাকরির পেছনে ছুটবে কেন? বরং এদেশের ছেলেমেয়েরা যেন নিজেরাই ব্যবসা-বাণিজ্য করে আত্মকর্মসংস্থান এবং অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করে। নিজেরা উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের চাকরির ব্যবস্থা করে।

তরিকত ফেডারেশনের সংসদ সদস্য নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইমলাম শান্তির ধর্ম, বিশ্বের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ধর্ম। কিন্তু ধর্মের নামে জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করে বিশ্বের কাছে পবিত্র এই ধর্মটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। তবে ইসলাম ধর্মের মধ্যে ভাগ, কে ভাল কে খারাপ, কে প্রকৃত ইসলামে বিশ্বাসী কে বিশ্বাসী নয়, কে সঠিভাবে ধর্ম পালন করে কে করে না, কে বেহেশেতে যাবে কে যাবে না- তার বিচার তো আল্লাহই করবেন? তার বান্দারা কেন এই বিচার করবেন? কে ভাল মুসলমান, কে মুসলমান নয়- তার বিচার করার ভার আল্লাহ তো কারো হাতে দেননি।

তিনি বলেন, কারো ধর্মে আঘাত দিয়ে কথা বলা, অন্য ধর্মবলাম্বীদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করা যাবে না। যার ধর্ম সেই পালন করবে। কোরআনেও আল্লাহ বলে দিয়েছেন যার যার ধর্ম তার তার কাছে। সেই বিশ্বাস যদি থাকে তাহলে এ দ্বন্দ্ব আর থাকে না। আর যারা সত্যিকারের ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন- যার যার ধর্ম পালনের সুযোগ দিতে হবে। অন্য ধর্মাবলাম্বীরা যেন আঘাত না পায়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলে আইন প্রণয়ন করার দাবি জানিয়ে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিলের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নিজেই কথা বলেছেন। তবে এ নিয়ে কোনো আইন করার প্রয়োজন নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও বিশ্ববিদালয় মঞ্জুরি কমিশনই (ইউজিসি) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে। এরপরও সরকার দেখবে এ বিষয়ে কী করা যায়।

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশিদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে তার সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে বলেন, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের জন্য চাকরিতে আলাদা কোটা কেন রাখতে হবে? এটা রাখার কোনো প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এদেশে ১৬ কোটি মানুষ রয়েছে। এই বিশাল জনসংখ্যা থেকে যদি কেউ কেউ বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান- সেটা দেশের জন্যই ভালো হয়। আর পৃথিবীটা এখন আর কোনো দেশে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীটাই এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ।

তিনি বলেন, প্রশ্ন উত্থাপনকারী সংসদ সদস্যের দলের (বিএনপি) আমলে শিক্ষার্থীদের হাতে অস্ত্র ও মাদক তুলে দিয়ে তাদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি ও বোমাবাজির মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গণগুলোকে অশান্ত করে তোলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই পরিবেশটা এখন আর নেই। সেশনজটও কমে এসেছে।

সরকার দলীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের অপব্যাখ্যা ও জঙ্গীবাদ সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। কোরআন ও হাদিসের আলাকে তা তরুণ শিক্ষার্থীদের বুঝাতে দেশের আলেম সমাজ সক্রিয় সহযোগিতা করছেন।

তিনি বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকসই করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সময়ানুবর্তিতা এবং সততার অনুশীলন করানো হচ্ছে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন বিপথগামী হয়ে জঙ্গীবাদে না জড়িয়ে পড়ে সেজন্য আমরা শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এগুলো হলো- শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জঙ্গীবাদ বিরোধী নানামুখী সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ১০ দিনের বেশি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সনাক্ত করছে; অনুপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করা অনুপস্থিতির কারণ সন্দেহজনক বলে প্রতীয়মান হলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিভাবক-শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীর সমন্বয়ে অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষা, অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমাজের গণমান্য মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সন্ত্রাসী ও ধর্মের নামে জঙ্গীবাদবিরোধী সভা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানে পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থে ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর বিবেচিত হতে পারে, এমন কোন কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবে না এবং সন্ত্রাসী বা জঙ্গী তৎপরতা বা এই জাতীয় কোন কার্যকলাপে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোনভাবেই কোন পৃষ্ঠপোষকতা করা যাবে না মর্মে সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা আরো জানান, জঙ্গী/সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সঙ্গে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যেন কোনভাবে সম্পৃক্ত থাকতে না পারে সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ চালু হওয়ার ফলে অন্যান্য অপরাধের মতো জঙ্গী কর্মকান্ডের সংবাদ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় জঙ্গীবাদ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক শহরের সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য সরকার নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। দেশের সকল জেলাকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনাসহ বাংলাদেশ রেলওয়েকে জনগণের কাছে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না, এটা বর্তমান সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *