| ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং | ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী | সোমবার

বাজেট ব্যয় মেটাতে ব্যাংক নির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার

Print Friendly, PDF & Email

আইন সমাজ ডেক্স, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ মঙ্গলবার :

সরকারের বাজেটে কোনো ভারসাম্য নেই। এ কারণে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধির মাত্রা অনেক কমে গেছে। সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমেছে। ফলে বাধ্য হয়েই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। ভারসাম্যহীন বাজেটের কারণে ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে সরকার। ফলে অর্থবছরের সাড়ে ছয় মাস না যেতেই সরকারের ব্যাংকঋণ অর্ধলাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও তিন হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা বেশি। সরকারের ব্যাপক হারে ঋণ নেয়ায় ব্যাংকের তারল্য সঙ্কট আরও বাড়বে এবং এটি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
এদিকে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, বিগত এক দশকে কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংকের কাছে সরকার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকার দেনা হয়েছে। সরকার ২০০৯  সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর নাগাদ বাংলাদেশ ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংক থেকে ১৩ লাখ ২৭ হাজার ৬২৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এই সময়ে পরিশোধ করা হয়েছে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৮৪০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থ্যাৎ এই সময়ে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ এক লাখ ৯৫ হাজার ৭৮৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি একদিনেই নেয়া হয়েছে রেকর্ড তিন হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। গত ১০ বছরের মধ্যে এত বেশি ঋণ নেয়ার নজির এবারই প্রথম। একক কোনো অর্থবছরের হিসাবেও এটি সর্বোচ্চ।
এদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার অস্বাভাবিক ঋণ নেয়ায় অর্থবছরের মাঝপথে এসেই মুদ্রানীতি সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহের (ব্রড মানি) লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১২.৫ শতাংশ। সেটি বাড়িয়ে ১৩ শতাংশ করা হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে মুদ্রানীতি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ৪৫তম সভায় এই সংশোধনী আনা হয়। এর ফলে বাজারে অতিরিক্ত আরো ছয় হাজার কোটি টাকার সরবরাহ বাড়বে বলে জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত নিরুৎসাহ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে ঋণের সুদহারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ জন্য বরাবরই ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে যতটা সম্ভব কম ঋণ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাঁরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সরকারের বাজেটে কোনো ভারসাম্য নেই। এর কারণ হচ্ছে, রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধির মাত্রা অনেক কমে গেছে। সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমে গেছে। ফলে বাধ্য হয়েই সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। তিনি বলেন, এমনিতেই ব্যাংকগুলো তারল্য সঙ্কটে আছে। তার ওপর সরকার বেশি মাত্রায় ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আরো কমে যাবে। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির আরো অবনতি হয়েছে। গত ডিসেম্বরে এই খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১০ শতাংশ। এটি গত সাত অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সাধারণত অর্থবছরের শুরু ও শেষের দিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে দেখা যায়। কিন্তু এবার অর্থবছরের শুরুতে যেমন বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, তেমনি মাঝামাঝি সময়েও প্রায় একই গতিতে ঋণ নেওয়া হচ্ছে। অর্থবছরের শেষ সময়েও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকঋণের এই পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকারের ঋণ নেওয়ার বর্তমান ধারাটি নজিরবিহীন, কারণ এ দেশের অর্থনীতি কখনও এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। সরকারের ব্যাপক হারে ঋণ নেয়ায় ব্যাংকের তারল্য সংকট আরও বাড়বে এবং এটি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে। ব্যাংক ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষের দিকে সরকারের এই খাত থেকে নেওয়া ঋণের অংক দাঁড়াতে পারে প্রায় ১০০ হাজার কোটি টাকা। যেখানে, চলতি অর্থবছরে ঋণ নেওয়ার সীমা হচ্ছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রাক্তন এই কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি খাত সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় কম ঋণ নিয়ে কাজ করছে এবং সরকারের উচ্চহারে ঋণ নেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বেসরকারি খাতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিলো ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যা সেপ্টেম্বর ২০১০ এর পরে সবচেয়ে কম। তিনি এই অবস্থার জন্য রাজস্ব সংগ্রহে পর্যাপ্ত চেষ্টা না করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করেন।
চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৬২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৪৭ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছে। রাজস্ব সংগ্রহের ঘাটতি নিয়ে আহসান তিনি বলেন, রাজস্ব আয়ের ঘাটতি ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের অর্থনীতি এখন গতিশীল নয়। উৎপাদন খাত সাবলীলভাবে চলছে না। ফলে, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সংগ্রহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি সাম্প্রতিক মাসগুলিতে উদ্বেগজনকভাবে কমেছে। এর প্রভাবে রফতানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গবর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যাপক পরিমাণে সরকারের ঋণ নেওয়ায় চলমান তারল্য সংকট আরও ঘনীভূত হবে। সুদ হার হ্রাস করার ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চ ব্যাংক ঋণ নেওয়ার বিষয়টি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আগামীতে আরও বাড়বে। ফলশ্রুতিতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে, যা সাধারণ মানুষকে সংকটে ফেলবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে শেয়ারবাজারে কিছু তারল্য সংকট থাকলেও ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট নেই। আবশ্যকীয় নগদ জমা (সিআরআর) সংরক্ষণ ও আবশ্যকীয় সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণের পরও তফসিলি ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে। এ তারল্যের পরিমাণ ২০১৯ সালের জানুয়ারি ৬৭ হাজার ৬০১ কোটি টাকা থেকে ৫৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ১ লাখ ৬ হাজার ১০১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে ঋণ আদায়ের হার কম হওয়ায় এবং প্রাইভেট সেক্টরে ঋণের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতও পুঁজিবাজারে কাঙ্খিত পর্যায়ে বিনিয়োগ করছে না। ফলে কিছু তারল্য সঙ্কটে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *