| ৬ই এপ্রিল, ২০২০ ইং | ২৩শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ১২ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী | সোমবার

সর্বনাশা বিপদ ধেয়ে আসছে বাংলাদেশের ভূখন্ডে : ড. তুহিন মালিক

Print Friendly, PDF & Email

ড. তুহিন মালিক : 

ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি পাস হয়েছে। এই বিল অনুযায়ী পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আগত সব অমুসলিম ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। তবে শুধু মুসলিমদের কোনো নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। এর আগে আসামে এনআরসির ফলে প্রায় ১৯ লাখ ভারতীয় নাগরিককে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিলো। আর তখন সবাইকে অবাক করে দিয়েই এই ১৯ লাখের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখেরও বেশি হিন্দু সম্প্রদায়ের নাগরিককে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলেও ঘোষণা করা হয়েছিলো। এখন এই বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের ফলে সেই ১৪ লাখেরও বেশি হিন্দু সম্প্রদায়কে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যবস্থা দেয়া হলো।

অন্যদিকে এই ১৯ লাখের মধ্যে বাকি রইলো প্রায় ৫ লক্ষ মুসলিম। যাদের ইতোমধ্যেই ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আর এই বিল পাসের মাধ্যমে তাদের নাগরিকহীন করে দেয়া হলো। এখন থেকে তারা ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে ভারতের মাটিতে অবৈধ হয়ে গেলো। এখন তাদের সহায়-সম্পত্তি, বাড়িঘর, ব্যবসাসহ সব কিছু রাষ্ট্রীয় আইনেই জোরজবরদস্তি অধিগ্রহণ করে নেয়া হবে। এরপর তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকানো হবে। রাতারাতি ভারতের এই মুসলিম নাগরিকরা রাস্তার ফকিরে পরিণত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পের বদ্ধ কারাগারে থাকতে বাধ্য হবেন।

এটাতো শুধু এক আসাম রাজ্যের ঘটনা। এরপর অমিত শাহের ঘোষণা মতে পুরো ভারতজুড়ে এনআরসির মারাত্মক খেলা শুরু হবে। ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকদের পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আগত ‘অনুপ্রবেশকারী’ ঘোষণা দিয়ে তাদের নাগরিকত্বহীন করে তাদের বাড়িঘর ক্রোক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকানো হবে। তবে ভারতের এনআরসি এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলে শুধু ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নাগরিকরা একাই ভয়াবহ বলির শিকার হবে না। বরং এতে ভারতের প্রতিবেশি পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান নামক মুসলিম রাষ্ট্রগুলো অচিরেই কোটি কোটি নাগরিকত্ববিহীন ভারতীয় মুসলিম নাগরিকের ভয়ংকর পুশইন তা-বের শিকারে পরিণত হবে। ইতোমধ্যেই ভারত থেকে বাংলাদেশের সীমান্তে অবৈধভাবে ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের গণহারে পুশইন করা শুরু হয়ে গেছে। সীমান্তে বিজিবি কয়েক দফা তাদের গ্রেপ্তার করে জেলেও পাঠিয়েছে। যদিও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এটা জানেনই না বলে গণমাধ্যমে জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ভারতের নানা প্রান্ত থেকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিয়ে অসংখ্য মুসলিম নারী-পুরুষদের আটক করে দলে দলে কলকাতায় নিয়ে এসে গোপনে ও জোর করে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে। যা খোদ ভারতের সংবাদ মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছে। আসলে ভারতের উগ্র হিন্দুবাদী সরকার জানে যে, নাগরিকত্ব হারানো মুসলিমদের ভারত থেকে তাড়ানোর আইনি পদ্ধতিটা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ। তাই ইতোমধ্যেই তারা তাদের তাড়ানোর ডিপোর্টেশন নামক স্বীকৃত আইনি পদ্ধতির ধারেকাছেও না গিয়ে উল্টা অপেক্ষাকৃত দুর্বল তাঁবেদার প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের পুশইন করা শুরু করে দিয়েছে। যা এই বিল পাসের মাধ্যমে এখন থেকে আরও ব্যাপকহারে ঘটতেই থাকবে। কারণ মোদী সরকার জানে, ভারতের ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুসারে তারা যদি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হয়েও থাকে, তাহলে আদালতে পেশ করে তারা যে অবৈধভাবে ভারতে ঢুকেছে সেটার প্রমাণটা আগে দিতে হবে। তারপর ভারতের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের বাংলাদেশে ডিপোর্ট করতে হবে। যা মোদী সরকারের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ। তাই এতোসব দীর্ঘ মেয়াদি পদ্ধতির তোয়াক্কা না করে সোজা গায়ের জোরে তাদের বাংলাদেশে পুশইন করাটাই হতে যাচ্ছে মোদী-অমিতের উগ্র হিন্দুবাদী চেতনার পরবর্তী পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো চরমভাবে বিভক্ত জাতীয় ঐক্যহীন ভারতের তাঁবেদার এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র কী তার উপর আসন্ন এই ভয়াবহ দুর্যোগের মোকাবেলা করার শক্তি রাখে? লেখক : আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *